
এম এ রশিদ, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করতে গিয়ে বনদস্যুদের চাঁদাবাজি, অপহরণ ও নির্যাতনের আতঙ্কে দিন কাটছে জেলে-বাওয়ালিদের। জীবিকার তাগিদে ঋণ করে বনে গেলেও কাঙ্ক্ষিত আয় হচ্ছে না। এর মধ্যে বনদস্যুদের চাঁদা দিতে গিয়ে ঋণের বোঝা আরও বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। বনদস্যু নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপের দাবিতে একাধিকবার আন্দোলন ও মানববন্ধন করেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না তাঁদের।
সোমবার (২ নভেম্বর) সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার জেলেরা বনদস্যুদের তৎপরতা বন্ধ, চাঁদাবাজি প্রতিরোধ এবং বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
মুন্সিগঞ্জের হরিনগর গ্রামের জেলে হাবিবুল্লাহ আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “সুন্দরবনে কোস্ট গার্ড, বন বিভাগ ও নৌপুলিশের পাশাপাশি মাঝেমধ্যে র্যাবের সদস্যরা অভিযান চালালেও বনদস্যুদের তৎপরতা কমছে না। নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রশাসনকে বারবার জানিয়েও প্রতিকার পাচ্ছি না বলে আমাদের অভিযোগ। প্রশাসন আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নিলে বনদস্যুদের দমন করা সম্ভব। বনদস্যুদের সহযোগী হিসেবে যারা লোকালয়ে থেকে বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা আর কত টাকা সুদে নিয়ে সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরতে যাব? আমাদের আর বেঁচে থাকার ইচ্ছা নেই। হয় বনদস্যুদের নির্মূল করা হোক, নয়তো আমাদের এই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে হবে।”
জেলে আজিজ সরদার বলেন, “আমরা এখন ডাকাতদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করছি। কিন্তু এই মানববন্ধনের ছবি তাদের কাছে পৌঁছে গেলে সুন্দরবনে প্রবেশের পর আমাদের ওপর নির্যাতন চালানো হতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে আমাদের প্রাণনাশের ভয় রয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, গত দুই দফায় চারটি পক্ষকে মোট দুই লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া কম পাওয়ায় আয় দিয়ে সংসার চালানো, বনদস্যুদের চাঁদা দেওয়া এবং সুদে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বনদস্যুদের তৎপরতা বন্ধ না হলে তাঁদের পেশা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না বলেও জানান তিনি।
সুন্দরবননির্ভর বনজীবীদের অভিযোগ, বনদস্যুদের ভয়ে অনেক সময় তাঁরা স্বাভাবিকভাবে মাছ আহরণ করতে পারেন না। নদী ও খালে নৌকা নিয়ে প্রবেশের পর বিভিন্ন চক্রের সদস্যরা টাকা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মারধর, অপহরণ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জেলেদের পরিবারের কাছেও মুঠোফোনে মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীদের স্বজনেরা।
জেলে আব্দুর রব বলেন, “নৌকা, জাল, খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে সুন্দরবনে যেতে অনেক টাকা খরচ হয়। এরপর বনদস্যুদের চাঁদা দিতে হলে মাছ বিক্রির আয়ের বড় অংশ চলে যায়। টাকা দিতে না পারলে অপহরণ ও নির্যাতনের ভয় থাকে। জীবিকার বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে বনে যেতে হচ্ছে।”
স্থানীয়দের হিসাবে, শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ, গাবুরা ও পদ্মপুকুরসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৩০ হাজার মানুষ মাছ আহরণ, কাঁকড়া সংগ্রহ ও অন্যান্য বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের জীবিকা নিরাপদ রাখতে বনদস্যুদের তৎপরতা বন্ধের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহল ও সমন্বিত অভিযান জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সুন্দরবন গবেষক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বাওয়ালি ও অন্যান্য বনজীবীর জীবন-জীবিকা এমনিতেই নানা সংকটে জর্জরিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া এবং বন বিভাগের বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে তাঁদের আয়-রোজগারে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর সঙ্গে বনদস্যুদের আতঙ্ক যুক্ত হওয়ায় পরিবারগুলো আরও বেশি বিপাকে পড়ছে।
তিনি বলেন, অনেক জেলে ঋণ নিয়ে নৌকা, জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জাম সংগ্রহ করেন। বনে গিয়ে চাঁদা দিতে হলে কিংবা অপহরণের শিকার হলে সেই ঋণের বোঝা পরিবারের ওপর পড়ে। কোনো জেলে দীর্ঘদিন নিখোঁজ বা জিম্মি থাকলে তাঁর পরিবারের সদস্যদের অনাহার ও আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হয়।
বনদস্যু দমনে বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন এই গবেষক। একই সঙ্গে সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ, খাল ও জেলেদের মাছ ধরার এলাকায় নিয়মিত টহল নিশ্চিত করা এবং বনদস্যুদের সহযোগী, চাঁদা আদায়কারী ও অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি।
এ বিষয়ে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহিনুল ইসলাম বলেন, “বনদস্যু নির্মূলে আমরা জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্য সদস্যরা আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চাইলে সমন্বিতভাবে অভিযান চালিয়ে বনদস্যু নির্মূলে কাজ করব। আমাদের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত রয়েছে।”
অন্যদিকে শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, “সুন্দরবনে বনদস্যু নির্মূলে আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছি। জেলেদের অভিযোগ সঠিক নয়। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছি। ইতিমধ্যে একজন বনদস্যুকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কেউ সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ আমাদের জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জেলে-বাওয়ালিদের দাবি, সুন্দরবনে নিরাপদে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে শুধু বনে অভিযান চালালেই হবে না; বনদস্যুদের সহযোগী, চাঁদা আদায়কারী ও অর্থের লেনদেনকারীদেরও শনাক্ত করতে হবে। তাঁরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে বনজীবীদের জীবিকা ও প্রাণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন
সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ রাজিব আলী
পুবালী মার্কেট শিরোইল কাচা বাজার রাজশাহী
মোবাইল : ০১৭১২-৪৫৪৬৮০, ০১৭৮৯৩৪৫১৯৬
মেইল : info@prokashkal.com
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০২৪ | সাইট তৈরি করেছে ইকেয়ার