
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী:
একসময় শখের বশে বাড়ির ছাদে শুরু হয়েছিল ড্রাগন ফলের চাষ। সময়ের ব্যবধানে সেই চাষ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে অনেক উদ্যোক্তা স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তবে সার ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণের সংকটে রাজশাহী অঞ্চলের চাষি ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও লোকসানের শঙ্কা।
ড্রাগন ফল ক্যাকটাস পরিবারের একটি উদ্ভিদে জন্মানো রসালো ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ফল। মধ্য আমেরিকা ও মেক্সিকো অঞ্চলে এর উৎপত্তি। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে বাণিজ্যিকভাবে ফলটির চাষ হচ্ছে। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ড্রাগন ফল বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় দিন দিন বাড়ছে ড্রাগন ফলের চাষ। কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় ২৫৮ হেক্টর জমিতে ৫ হাজার ১৭ মেট্রিক টন, নওগাঁয় ৭৬ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ১৩৮ মেট্রিক টন, নাটোরে ১৬৯ হেক্টর জমিতে ১ হাজার ৭২২ মেট্রিক টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১২ হেক্টর জমিতে ১৯২ মেট্রিক টন ড্রাগন ফল উৎপাদিত হয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যানের বছর সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ছাদবাগন থেকে বাণিজ্যিক চাষ
ড্রাগন ফল চাষের জন্য পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা রয়েছে—এমন উর্বর দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি উপযোগী। পর্যাপ্ত সূর্যালোক, পরিমিত সেচ, সুষম সার প্রয়োগ ও নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। গাছ লতানো হওয়ায় এর বৃদ্ধির জন্য পিলার বা খুঁটির ব্যবস্থা করতে হয়।
সাধারণত ডাল বা কাটিংয়ের মাধ্যমে ড্রাগন ফলের চারা তৈরি করা হয়। চারা রোপণের ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে গাছে ফুল আসতে শুরু করতে পারে। জাত, আবহাওয়া ও পরিচর্যার ওপর ফলন নির্ভর করে। ফলটিতে খাদ্য-আঁশ, ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান থাকায় স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যেও এর চাহিদা বাড়ছে।
৩০ বিঘার বাগানে কর্মসংস্থান ২০ জনের
রাজশাহীর ড্রাগন ফলচাষি ও উদ্যোক্তা ওসমান ফারুক জনি জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। পরে চাকরি ছেড়ে নতুন কিছু করার প্রত্যাশায় ড্রাগন ফল চাষে যুক্ত হন। ২০২০ সালে এক বন্ধুর সঙ্গে যৌথভাবে ১৩ বিঘা জমিতে চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর নিজের ৩০ বিঘা জমিতে ড্রাগন ফলের বাগান রয়েছে। সেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে ২০ জনের।
তবে বাগান পরিচালনায় সার ও কৃষি উপকরণের সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। জনি বলেন, নিজের অর্থ ও পরিশ্রম দিয়ে তিনি এই পর্যায়ে এসেছেন। সরকারি প্রণোদনা ও কৃষি বিভাগের কাছ থেকে প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাননি। বড় বাগানের জন্য যে পরিমাণ সার প্রয়োজন, তার তুলনায় অল্প সার দিয়ে চাষাবাদ পরিচালনা করা কঠিন।
উৎপাদন ব্যয় কমাতে কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে ভর্তুকি বা বিশেষ সুবিধা চালুর দাবিও জানান তিনি। তাঁর আশঙ্কা, সার ও অন্যান্য উপকরণের সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে অনেক উদ্যোক্তা কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।
সহযোগিতার আশ্বাস কৃষি বিভাগের
রাজশাহী কৃষি বিভাগের অতিরিক্ত উপপরিচালক মিতা সরকার ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক জানান, ড্রাগন ফলচাষি ও উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশি ফলের পাশাপাশি ড্রাগন ফলের চাহিদা বাড়ায় অনেকেই এ ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
অতিরিক্ত উপপরিচালক মিতা সরকার বলেন, ড্রাগন ফল চাষে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সহযোগিতা দেওয়া হবে।
চাষি ও উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, সার ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি সহায়তা বাড়ানো হবে। এতে ড্রাগন ফলের চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
