আজ- মঙ্গলবার, ১০ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সুজাবত আলীকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভূক্তির জন্য জোর দাবি পরিবারের

by Prokash Kal
views

গোলজার হোসেন হীরা, বিশেষ প্রতিনিধি:

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের অন্তর্গত ঐতিহাসিক যুদ্ধ বিজড়িত পলাশডাঙ্গা (মধ্যভদ্রঘাট) বীর মুক্তিযোদ্ধা সুজাবত আলী ওরফে আব্দুল সাত্তার এর নাম মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য জোর দাবি জানাচ্ছিজানাচ্ছেন তার পরিবার
২২,নভেম্বর ২০২৩ রোজ কয়েক দিন আগে মুক্তিযোদ্ধা সুজাবত আলী ওরফে আব্দুস সাত্তার বলেছিলেন, সে সময় ২৫ শে মার্চ মধ্য রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে তখন সারাদিন সোনালী জুট মিলে দ্বায়িত্ব পালন করে তিনিও ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।

হঠাৎ চারদিকে গোলাগুলির শব্দে আর চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গলো। বাবা ভয়ে আতঙ্কে উঠলো, পাকিস্থানী বাহিনী নরপিচাশের দলেরা রাতের অন্ধকারে অনেক লোকের প্রাণ নিয়ে নিলো। চারদিক শুধু যুদ্ধের আমেজ বিরাজ করছে। পৃথিবী যেন নিরব দৃষ্টিতে অবলকন করছে বাড়িতে খবর নিলেন,সবাই কেমন আছে জানতে। যুদ্ধের ডামাডোল বেজে উঠলো ডাক দিলেন যুদ্ধের। তখন কর্ণেল আতাউল গনীর নেতৃত্বে গঠন করা হলো মুক্তিবাহীনী নামে একটা শক্তিশালী দল। নেমে পড়লেন যুদ্ধে।

চলছে দু পক্ষের লড়াই। ঝড়ে পড়লো হাজার হাজার লোকের প্রাণ। এ যেনো রক্তের বন্যা বয়ে চলছে চারদিক। আগুনের লিলাহীন শিখা দাও দাও করে জ্বলছে চারদিক। হঠাৎ মনে পড়ে গেলো বাড়ীর কথা। কয়েক দিনের জন্য বাড়ী চলে এলেন ছায়াঘেরা সেই পলাশ ডাঙ্গাতে। বাড়ী এসে দেখেন, একই অবস্থা, চারদিকে চলছে শুধু রক্তের মিছিল।

পলাশডাঙ্গাতে আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে মুক্তিফৌজ বাহিনীতে যোগ দিলেন আমার বাবা আব্দুস ছাত্তার ওরফে সুজাবত আলী। চান্দুল্লা প্রামানিক ছিলেন তখনকার গ্রামের মাতব্বর। ৬ পুত্র এক কন্যা। মুক্তিফৌজ বাহিনী এসে বললেন,দুইজন ছেলেকে দিতে হবে আমাদের বাহিনীতে।

ভয়ে প্রথমে জবাব না দিলেও পরেক্ষনেই রাজি হয়ে গেলো। শুরু হয়ে গেলো দু’ পক্ষের গোলাগুলি যুদ্ধ। গ্রামের অনেক ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দিলেন হানাদার বাহিনী। আমার মার দাদার বাড়িটি ছিলো প্রথম টার্গেট। কারণ তার দুই ছেলেই ছিলো মুক্তিফৌজে পলাশডাঙ্গা থেকে সূদূর দক্ষিণে অলিপুর নামক স্থানে আমার আর অনান্য চাচাকে সহ পরিবারের সবাইকে নিরাপদে রেখে আসতে বললেন।

রক্ত মিছিলতো চলছেই, এর মধ্যই কয়েকটা গরু নিতে এসে হানাদার, পশুদের গুলিতে আমার চাচা আব্দুল গফুরকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে।  তাকে দেখতে ও মাটি দিতে আসতে পারিনি কেউ। শিয়াল কুকুর রাতভর দেহকে ছিন্ন বিছিন্ন করে খেয়েছে। শরীরের এক এক জায়গায় এক এক টুকরা মাংস, কলিজা, পড়ে আছে। কি মর্মান্তিক পরিবেশ! বলতে গেলে গাঁ শিউরে ওঠে। সে সময় যার প্রিয়জন চলে গেছে তারাই শুধু বলতে পারে প্রিয়জন হারানোর ব্যথা। আমার চাচিটা তো শুনেই অর্ধ পাগল হয়ে গেছে। এখনো সে বেঁচে আছে স্বামীহারা হয়ে।
হানাদার পশুরা তার মেয়ে লাভলী আমাদের জানান আমার বাবার দাদিমার ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিবে, এমন সময় আমার বাবার দাদিমা ঘরের কোণ থেকে ভয়ে ভয়ে বেড়িয়ে এসে পবিত্র কোরআন শরীফ বুকে নিয়ে ওদেরকে কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আমি বুড়ি মানুষ। আমাকে মেরনা, আর আমার এই ঘরটুকু জ্বালিয়ে দিওনা। আমার নাতিকে তোমরা গুলি করে মেরে ফেলেছো। পশুরা কি ভেবে বাবার দাদিমাকে আর মারেনি। চলছে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ।

আমার বাবা আর চাচা যুদ্ধ শেষ করে বাড়ি ফিরলেন বিজয় নিয়ে। এসে ভাই হারানোর বেদনায় পুরো পরিবার যেনো শোকে কাতর। পরর্বতীতে যুদ্ধ শেষে বিহারী নামক নরপিচাশ ও যুদ্ধে বাধাদানকারী ও পাকিস্থানী বাহিনীদের সাহায্যকারী আমাদের দেশীয় দালাল রাজাকারদের নিধন করেন। পরে আবার কর্মস্থলে ফিরে যান আমার বাবা। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধে  অংশগ্রহণ করেন। পরর্বতীতে দীর্ঘ সতের বছর চাকরী রত অবস্থায় রাজনৈতিক  ঝামেলার কারণে চাকরীচ্যুত হন।

ফিরে আসেন ছায়াঘেরা সেই পলাশডাঙ্গাতে। চাকরীচ্যুত হওয়ার পর সংসারের অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে আমার বাবা নিজের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় আছে কিনা জানতে পারেনি। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আব্দুস সাত্তার নামে কামারখন্দে অনেক তালিকাই ছিলো। কিন্তু আমার বাবার নাম কোন তালিকায় রয়েছে? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে।

আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও কোনো সম্মান পাননি। বড় অবহেলায় আমার বাবা অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মনে অনেক কষ্ট নিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আমার বাবার শেষ ইচ্ছা ছিল প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করা।কিন্তু অর্থের অভাবে বাবাকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিতে পারিনী। এখানে না বললেই নয়! আমার বাবা কিন্তু  প্রত্যকটা মিটিং এ উপস্থিত ছিলেন, ছয় দফা আন্দোলন থেকে ১৯৬৯ গণঅভ্যুত্থান  আরো অনেক আন্দোলনে।

ঢাকা রেসকোর্স ময়দানেও উপস্থিত ছিলেন। বাবার কাছে থাকা কিছু  কাগজ পত্র সে সময় ট্রেন ডাকাতে সব হারিয়ে যায়। বাবাকে মেরে সব ছিনিয়ে নিয়েছে। বাবা অজ্ঞান অবস্খায় তিন দিন পর জ্ঞান ফিরে পান।স্বাধীনতার পরপরই এই ঘটনা ঘটে। তাই বাবার না পাওয়া, না বলা কথাগুলো আমাকে আজও কষ্ট দেয়। যদিও আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। তার পরেও মুক্তিযোদ্ধার একজন মেয়ে হয়ে নিজেকে গর্ব বোধ করি। এমতাবস্থায় বাবার নামটা মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের কাছে আকুল আবেদন আমার বাবার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।

You may also like

Leave a Comment

শিরোনাম:

সম্পাদক ও প্রকাশক মোঃ রাজিব আলী

পুবালী মার্কেট শিরোইল কাঁচা বাজার রাজশাহী

মোবাইল : ০১৭১২-৪৫৪৬৮০, ০১৭৮৯৩৪৫১৯৬

মেইল : info@prokashkal.com

© ২০২৪ প্রকাশকাল সর্বসত্বাধিকার সংরক্ষিত