
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চারপাশে সবুজের সমারোহ, শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বসিত কোলাহল আর কচি হাতে মাটির স্পর্শ, রোববার সকালটা এভাবেই এক নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছিল রাজশাহী স্যাটেলাইট টাউন হাই স্কুলের জীবনে। গতানুগতিক ক্লাসের বাইরে এসে শিক্ষার্থীরা পেল প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসার সুযোগ, শিখল পরিবেশের প্রতি ভালোবাসার এক বাস্তব পাঠ। উপলক্ষ, ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক (সিএসআর) কার্যক্রমের আওতায় ‘এনসিসি নিসর্গ আপনার সাথে, সবুজের পথে’ শীর্ষক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের জাতীয় সংকটের প্রেক্ষাপটে এনসিসি ব্যাংকের এই উদ্যোগটি পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। দেশব্যাপী ৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সবুজায়নের যে বৃহৎ পরিকল্পনা ব্যাংকটি গ্রহণ করেছে, তারই অংশ হিসেবে রাজশাহী অঞ্চলের চারটি স্কুলকে বেছে নেওয়া হয়। রোববার (২৭ জুলাই) এই কর্মসূচির আওতায় ব্যাংকের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজশাহী স্যাটেলাইট টাউন হাই স্কুল প্রাঙ্গণে রোপণ করা হয় আম, জাম, কাঁঠাল, অর্জুন, বহেরা, হরীতকী, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির ৩২টি বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছের চারা।
তবে এই সবুজ বিপ্লবের ঢেউ শুধু স্কুলের সীমানায় আটকে থাকেনি। তাকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে প্রতিটি শিক্ষার্থীর বাড়ির আঙিনায়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে আরও ১০০টি বিভিন্ন প্রজাতির চারা। এই কর্মসূচির সবচেয়ে উদ্ভাবনী এবং প্রশংসনীয় দিক হলো বাড়িতে লাগানো এই গাছগুলোর সঠিক যত্ন ও পরিচর্যার জন্য শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করার ঘোষণা। এর মাধ্যমে বৃক্ষরোপণকে একটি সাধারণ ঘটনা হিসেবে না দেখে, একে একটি দীর্ঘমেয়াদী অভ্যাসে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন এনসিসি ব্যাংকের উপ-প্রধান মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা ও এএমএল অ্যান্ড সিএফটি বিভাগের প্রধান মো. বাকের হোসেন। তিনি বলেন, “এনসিসি ব্যাংক তার বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পাশাপাশি এই দেশ ও সমাজের প্রতি একটি গভীর দায়বদ্ধতা অনুভব করে। ‘নিসর্গ’ আমাদের সেই অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশ। আজ আমরা শুধু ৩২টি চারা রোপণ করছি না, আমরা এই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনে একটি সবুজ স্বপ্ন রোপণ করছি। এই গাছগুলো বড় হয়ে তাদের ছায়া দেবে, ফল দেবে, নির্মল বাতাস দেবে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, এই গাছগুলোর সঙ্গে বড় হতে হতে এই শিশুরা প্রকৃতির প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “গাছ আমাদের নিঃস্বার্থ বন্ধু। এই বন্ধুর যত্ন নেওয়ার শিক্ষা পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি হাতে-কলমে হওয়া জরুরি। পুরস্কারের ঘোষণাটি তাদের উৎসাহিত করার একটি উপায় মাত্র। আমরা চাই, তারা গাছের মালিকানা অনুভব করুক, এর বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপের সাক্ষী হোক। একদিন হয়তো আমরা থাকব না, কিন্তু এই গাছগুলো এই মহৎ উদ্যোগের এবং ভালোবাসার স্মৃতি বহন করে চলবে।”
এনসিসি ব্যাংক পিএলসি, রাজশাহী শাখার ব্যবস্থাপক মো. সাইফুল্লাহ আল আমিনের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ব্যাংকের উত্তরাঞ্চলের আঞ্চলিক প্রধান মো. ওমর শরীফ এবং স্কুলের প্রধান শিক্ষক তারিকুল ইসলাম ও সহকারী প্রধান শিক্ষক সাদেকুর রহমান বক্তব্য রাখেন।
সভাপতির বক্তব্যে মো. সাইফুল্লাহ আল আমিন বলেন, “রাজশাহীর মতো একটি ঐতিহ্যবাহী শহরে, স্যাটেলাইট টাউন হাই স্কুলের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে এই সবুজ কর্মসূচি আয়োজন করতে পেরে আমরা গর্বিত। আমাদের লক্ষ্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে একটি সুন্দর ও দূষণমুক্ত বাংলাদেশ তুলে দেওয়া। আজকের এই শিক্ষার্থীরাই সেই ভবিষ্যতের কাণ্ডারি। তাদের হাতে গাছের চারা তুলে দেওয়ার মাধ্যমে আমরা মূলত সবুজের দায়িত্বটাই হস্তান্তর করছি।”
ব্যাংকের উত্তরাঞ্চলের আঞ্চলিক প্রধান মো. ওমর শরীফ দেশের পরিবেশগত সংকটের চিত্র তুলে ধরে বলেন, “আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় মোট ভূখণ্ডের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা অপরিহার্য। কিন্তু আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ এর চেয়ে অনেক কম। এই বিরাট ঘাটতি পূরণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি এনসিসি ব্যাংকের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। প্রতিটি বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধার, পতিত জমিতে গাছ লাগিয়ে আমরা এই সবুজ ঘাটতি পূরণ করতে পারি।”
রাজশাহী স্যাটেলাইট টাউন হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক তারিকুল ইসলাম বলেন, “শ্রেণিকক্ষে আমরা শিক্ষার্থীদের পরিবেশ দূষণ ও বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পড়াই। কিন্তু আজ তারা হাতে-কলমে বৃক্ষরোপণ করে যে বাস্তব জ্ঞান ও আনন্দ লাভ করল, তা হাজারো ক্লাসের সমান। এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সচেতন ও মানবিক হিসেবে গড়ে তুলতে বিরাট ভূমিকা রাখবে।”
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল বিপুল উৎসাহ। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র মাহিন বলে, “আমি একটি বেল গাছ পেয়েছি। আমাদের বাড়ির ছাদে টবে লাগাব। নিজের হাতে লাগানো গাছের ফল খেতে নিশ্চয়ই অনেক ভালো লাগবে। আমি গাছটার খুব যত্ন নেব এবং সঠিক পরিচর্যা করে পুরস্কার নেব।”
পরিবেশবিদরা বলছেন, শৈশবে এই ধরনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণের একটি দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, “শিশুরা যখন নিজের হাতে একটি চারা রোপণ করে এবং তার বেড়ে ওঠা দেখে, তখন প্রকৃতির সঙ্গে তাদের একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এটি তাদের মধ্যে সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ এবং প্রকৃতির প্রতি সম্মানবোধ তৈরি করে, যা প্রাপ্তবয়স্ক হলেও তাদের আচরণে প্রতিফলিত হয়। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য।”
সব মিলিয়ে, এনসিসি ব্যাংকের এই কর্মসূচিটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বৃক্ষরোপণ ছিল না, বরং এটি ছিল প্রকৃতি ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে একটি নিবিড় সেতুবন্ধন রচনার আন্তরিক প্রয়াস, যা একটি সবুজ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে একটি অর্থবহ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
