
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দুই এনজিও থেকে আড়াই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সবজি আবাদ শুরু করেছিলেন কৃষক শফিকুল ইসলাম (৪০)। প্রথম সবজি করলা থেকে লাভ করেছিলেন দেড় লাখ টাকা। তবে দ্বিতীয় ফসল ফুলকপিতে ডুবে গেছেন তিনি। ছত্রাকনাশক কীটনাশকে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে শফিকুলসহ অন্তত ডজন খানেক কৃষকের। এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। এমন ধাক্কায় বর্তমানে কৃষকরা প্রায় পাগলপারা। ঘটনাটি ঘটেছে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার গগনবাড়িয়া এলাকায়।
জানা গেছে, এই এলাকায় এক টেন্ডারে তিন ফসল করে থাকেন কৃষকরা। এবার ১৫ বিঘায় ফুলকপির আবাদ করেন তারা। প্রতি বিঘা টেন্ডার বাবদ খরচ ৭০ হাজার টাকা। করলা, ফুলকপি ও আলু চাষ শেষে নতুনভাবে টেন্ডার নিতে হয়। কৃষক শফিকুল ইসলাম প্রায় ১৮ বছরের কৃষিকাজের অভিজ্ঞতায় এবারই প্রথম এরকম ক্ষতির শিকার হলেন। ঋণের টাকায় তিন বিঘা জমি টেন্ডার নিয়ে সবজি চাষ করেন তিনি। করলা চাষে বিঘাপ্রতি তার খরচ হয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় এক লাখ টাকার করলা বিক্রি করেছিলেন। সেখান থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ করেন তিনি। এর চেয়েও বড় আয়ের উৎস ছিল ফুলকপি। এতে বিঘাপ্রতি দুই লাখ টাকা করে লাভ হয়ে থাকে। এক বিঘা ৭ হাজারের বেশি চারা থাকে। প্রতিটি ফুলকপি ৪০ টাকা করে হলেও প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয় এক বিঘায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জমিতে কিস্তির কাগজ ও কীটনাশকের প্যাকেট হাতে বসে আছেন স্থানীয় কৃষকরা। হযরত আলী, সেকেন্দার, মুন্টু, লাল্টু, আজিবর, কামরুল, জারজিদ, রবিউল, ছানারুল, আতাউর, শহিদুল, হাসানসহ স্থানীয় অন্যান্য কৃষকরা সেখানে অশ্রুসিক্ত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিলাপ শুরু করে একপর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন সেকেন্দার নামে এক কৃষক। তাকে এলাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
কৃষকরা বলেন, নিউজিম ছত্রাকনাশকের কারণে ফুলকপি নষ্ট হয়েছে। আমরা ক্ষতিপূরণের দাবি জানালে কোম্পানির লোকেরা বিঘাপ্রতি ৮০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি হয়েছিল। কোম্পানি ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলে বিষয়টি মিটমাট হয়। কিন্তু ওই কোম্পানির লোকজন ফোন না ধরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এরমাঝে তারা বাজার থেকে ওই লটের বিষ সেরিয়ে ফেলেছে। ডিলার আর বিষ কোম্পানির লোক আমাদের ক্ষতি করেছে।
তারা বলেন, আমরা কৃষি অফিসারকে জানাই। তিনি মাঠে এসে মাটি, ফসল ও বিষ চেক করে বলেছেন, এটা বিষের জন্যই হয়েছে। পরে টাকা দিয়ে কৃষি কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তারা। কৃষকরা জানান, ইউএনও‘র কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কোনো সুরাহা হচ্ছে না। একজন কৃষক বলেন, এ ক্ষতির দায় বিষ কোম্পানির আর ডিলারের।
হযরত আলী নামের কৃষক বলেন, বাড়িত থাকতে পারছি না, কিস্তি আলা এসে তাড়াচ্ছে। আর কোনো আবাদ করতে পারব না ভাই। আমাদেরকে বাঁচান ভাই। সেকেন্দার নামে কৃষক বলেন, এখানে আমরা ১৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। সবাই কিস্তিতে টাকা নিয়ে ফসল করেছিলাম। আমি আড়াই লাখ টাকা লোন নিয়ে ২ বিঘা ৩ কাঠায় ফসল করি। সব ক্ষতি হয়ে গেলো। হযরত আলীও নিয়ে ফসল নিয়ে। তিনি বলেন, আমরা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আমাদের সব ধ্বংস হয়ে গেল। মরা ছাড়া কোনো উপায় নাই।
কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, আমার ৭ লাখ টাকা লাভ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফুলকপি তোলার কয়েকদিন আগে পঁচন ধরে সব নষ্ট হয়ে গেছে। ব্লেসিং এগ্রোভেট কোম্পানির ছত্রাকনাশক কীটনাশক নিউজিম (কার্বেনডাজিম) দিই। এই কীটনাশকে কপাল পুড়লো আমাদের। এলাকার সব কৃষকের ১৫ বিঘা জমির ফুলকপি নষ্ট হয়ে প্রায় ৩৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। মা, এক ছেলে, এক মেয়ে ও ভাইদের নিয়ে সংসার চলত ফসল চাষ করে। কিন্তু এখন নিঃস্ব হয়ে গেছি। এখন মরা ছাড়া কোনো উপায় নাই আমাদের।
ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে বুধবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে জমিতে মানববন্ধন করেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। এসময় তারা বলেন, বিষের সমস্যার জন্য ক্ষতি হয়েছে। আগে তো ক্ষতি হয়নি। এবার হলো কেন? ফুলকপি নষ্টের পর ঘাস ও পালন শাকে বিষ দিয়ে দেখেছি, ঘাস ও শাক নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আমরা কীভাবে চালাবো সংসার, টেনশনে কিছু করতেও পারছি না। ফুলকপির পর আলু করতাম, এখন তো আলু করতেও সাহস পাচ্ছি না। নায্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তারা।
এ বিষয়ে ব্লেসিং এগ্রোভেট কোম্পানির এসইও মোস্তফিজুর রহমান বলেন, মানে কোয়ালিটিতে আমার মালে কোনো সমস্যা নাই। ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন তিনি। স্থানীয় কীটনাশক ডিলার ছাতাহার আলী বলেন, আমি অনেক আগে থেকে দোকান করি। আগেও এই কীটনাশক বিক্রি করেছি। এবারই প্রথম এরকম হয়েছে। এখানে আমার কোনো হাত নাই। বিষয়টি কোম্পানিকে জানিয়েছে। ঘটনার পর থেকে।তাদের কোনো যোগাযোগ নাই।
এ ব্যাপারে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন বলেন, আবারও স্প্রে করেছি। রিপোর্ট কেমন আসে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী বলেন, স্যাম্পল কালেকশন করে পাঠানো হয়েছে। চেষ্টা করছি কৃষকদের পাশে থাকার। অথচ উল্টো তারা আমাদেরকে ব্লেইম দিলে সেটা তো দুঃখজনক। ক্ষতিপূরণের বিষয়টি দেখার জন্য কোম্পানির লোককে বলেছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহীর উপ-পরিচালক উম্মে ছালমা প্রকাশ কালকে জানান, ঘটনাটি শুনেছি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
