আজ- বুধবার, ৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চূড়ান্ত বিজয়ের ৫ আগস্ট, এক নতুন বাংলাদেশের জন্ম

by Prokash Kal
১৮ views

নিজস্ব প্রতিবেদক:

একদিকে সরকার ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের কারফিউ, অন্যদিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। আগের কয়েকদিনের নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের পর ৫ আগস্ট সকালটি কেমন হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ছিল চরম উৎকণ্ঠা। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব শঙ্কা ও কারফিউ দূরে ঠেলে ছাত্র-জনতার ঢলে অবরুদ্ধ ঢাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। বিকেলে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ের চূড়ান্ত বিজয়ের স্বাদ পায় আন্দোলনকারীরা।

৫ আগস্ট ভোর থেকেই রাজধানীর চিত্র ছিল থমথমে। মহাখালী, বনানী, গুলশান, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও রামপুরাসড়কসহ বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নেয় সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‍্যাব ও পুলিশ। বসানো হয় কাঁটাতারের ব্যারিকেড। ঢাকার প্রবেশপথ যাত্রাবাড়ী, গাবতলী ও আব্দুল্লাহপুরে একাধিক চেকপোস্ট বসিয়ে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। সাধারণ মানুষকে ঘরে থাকার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়। সকাল ১০টা পর্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে; এমনকি কারফিউ পাসধারীরাও পথে পথে তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন।

সকাল ১০টার পর থেকে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামতে থাকেন এবং তাদের সঙ্গে যোগ দেন শিক্ষক, চাকরিজীবী, শ্রমিক, অভিভাবকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। বেলা ১১টার দিকে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও
আন্দোলনকারীদের শাহবাগমুখী অগ্রযাত্রা থামানো যায়নি।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বহির্বিভাগের পাশের গলিতে শতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে এক দফার স্লোগান দিতে থাকেন। সে সময় শাহবাগে সেনাবাহিনীর কড়া অবস্থান ও সাঁজোয়া যান ছিল। হাসপাতালগামী মানুষদেরও তল্লাশি করা হচ্ছিল। বেলা সাড়ে ১১টার পর চানখাঁরপুল ও শাহবাগ এলাকায় গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাকর হয়ে ওঠে।

দুপুর ১২টার কিছু পর মৎস্য ভবনের দিক থেকে প্রায় ৫০০ মানুষের একটি মিছিল শাহবাগের দিকে এগিয়ে আসে, যার সামনের সারিতে ছিলেন প্রায় ৫০ জন নারী। মিছিলটি ওভারব্রিজের কাছে পৌঁছালে সেনাবাহিনী থামানোর চেষ্টা করে। তখন প্রথম সারির আন্দোলনকারীরা সেনাসদস্যদের হাতে ফুল তুলে দেন। এরপরই জনস্রোত সব ব্যারিকেড অতিক্রম করে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয়।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও মানুষ এসে যোগ দিলে শাহবাগ ও আশপাশের সড়ক জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বেলা আড়াইটার দিকে দেশজুড়ে খবর ছড়িয়ে পড়ে, টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। শুধু তাই নয়, জনরোষ থেকে বাঁচতে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন।

যে গণভবন ছিল ক্ষমতার অলঙ্ঘনীয় কেন্দ্রবিন্দু, মুহূর্তের মধ্যেই তা পরিণত হয় জনতার উল্লাসের জায়গায়। লাখো মানুষ ঢুকে পড়ে গণভবনে। কেউ উল্লাস করছে, কেউ ছবি তুলছে, আবার কেউ দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। জাতীয় সংসদ ভবনও সেদিন চলে যায় সাধারণ মানুষের দখলে। এক নিমিষেই ধসে পড়ে দীর্ঘদিনের এক প্রতাপশালী শাসনব্যবস্থা।

You may also like

Leave a Comment

শিরোনাম: