সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, ফোনে কথা বলতে অনীহা, গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে বক্তব্য না দেওয়া এবং সাংবাদিকদের বিভিন্নভাবে অপমান করার অভিযোগ উঠেছে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মিজ কাউসার আজিজের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদে জেলা প্রশাসকের আচরণ নিয়ে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে প্রেসক্লাবের অস্থায়ী কার্যালয়ে সংগঠনের নির্বাহী কমিটির সভায় এসব অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় নির্বাহী কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বক্তারা বলেন, জেলার বিভিন্ন সমস্যা, অনিয়ম ও জনদুর্ভোগ নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা পাওয়ার পরিবর্তে নানা সময়ে অসহযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য নেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে রূঢ় আচরণের অভিযোগ রয়েছে।
প্রেসক্লাবের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া সম্পাদক এবং যমুনা টেলিভিশনের নিজস্ব প্রতিবেদক আকরামুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাতক্ষীরা জেলা কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া হত্যা মামলার আসামি আব্দুল আলিম পরবর্তীতে কলারোয়া উপজেলা ভূমি অফিসে জমি-জমা সংক্রান্ত একটি মামলা পরিচালনা করছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করতে যান।
তার দাবি, গত বুধবার কলারোয়া উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনারের (ভূমি) বক্তব্য নিতে চাইলেও তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। পরে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান তিনি।
আকরামুল ইসলাম অভিযোগ করেন, পলাতক আসামি কীভাবে ভূমি অফিসে মামলা পরিচালনা করছেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মিজ কাউসার আজিজ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। এ সময় তিনি সাংবাদিকের অন্য একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং সাংবাদিককে ভর্ৎসনা করেন বলে অভিযোগ করেন আকরামুল ইসলাম।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে জেলা প্রশাসক যমুনা টেলিভিশনে তার চাকরি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। পরে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হাসেমসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ক্যামেরাপার্সন ইয়ারুল ইসলামের কাছে থাকা ক্যামেরা পরীক্ষা করেন বলেও তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান বলেন, গত ২৯ জুলাই সদর হাসপাতাল মোড়ের দুটি ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেন এনডিসি তাজুল ইসলাম। অভিযানের তথ্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংবাদ প্রকাশ না করার পরামর্শ দেন এবং বিস্তারিত তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আসাদুজ্জামান আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে পরদিন কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে গেলে তিনি সাংবাদিকদের বক্তব্য না শুনেই তাদের ভর্ৎসনা করেন।
প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম বেলাল হোসাইন অভিযোগ করেন, সংবাদ-সংক্রান্ত বিষয়ে জেলা প্রশাসককে ফোন করলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি ক্ষুব্ধ হন। সাংবাদিকদের বক্তব্য দেওয়া জেলা প্রশাসকের কাজ নয়—এমন মন্তব্য করে তিনি ফোন রেখে দেন বলেও দাবি করেন বেলাল।
একই ধরনের আচরণের শিকার হয়েছেন মাইটিভির সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ফয়জুল হক বাবুসহ আরও কয়েকজন সাংবাদিক—সভায় এমন অভিযোগও উঠে আসে।
সভায় গত ৫ আগস্ট সাতক্ষীরায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহতদের মধ্যে উপহার সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। ওই অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদের প্রশাসকসহ রাজনৈতিক নেতাদের মঞ্চে আমন্ত্রণ না জানানোয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেছিলেন বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রাহমাতুল্লাহ পলাশের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, মঞ্চে কাউকে আমন্ত্রণ না জানানোয় জেলা পরিষদের প্রশাসক হাবিবুল ইসলাম হাবিবের নেতৃত্বে তারা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।
সার্বিক বিষয়ে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং বাংলাদেশ বেতার ও ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সাতক্ষীরা জেলা প্রতিনিধি আবুল কাসেম বলেন, জেলার সমস্যা, সম্ভাবনা ও জনস্বার্থের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অতীতে কোনো জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে সাংবাদিকরা এমন অসহযোগিতার মুখোমুখি হননি।
তিনি বলেন, অতীতে জেলা প্রশাসকের সরকারি বাসভবন থেকেও গভীর রাতে সাংবাদিকরা প্রয়োজনীয় বক্তব্য পেয়েছেন। জেলা প্রশাসক রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। তাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং গণমাধ্যমকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক মনোভাব থাকা প্রয়োজন।
আবুল কাসেম আরও বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা। সেই জায়গা থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
