নিজস্ব প্রতিবেদক,
শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠ গ্রহণের চেয়ে কোচিংনির্ভরতা, মুঠোফোনে আসক্তি ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাওয়াকে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন। তাঁর মতে, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও কোচিং সেন্টারের পাঠদানের ধরন এক নয়। প্রশ্নের ধরনে পরিবর্তন এলে কোচিংনির্ভর শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়ে। এবার রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার কমে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের অর্ধেকের বেশি অকৃতকার্য হয়েছেন। গত শনিবার বেলা ১১টার দিকে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছিলেন ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৩৬ জন। তাঁদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেন ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫৬ জন। পাস করেছেন ৬১ হাজার ৮৯৪ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৭৫ হাজার ৪৬২ জন। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ১৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
এবিষয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন বলেন, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠ গ্রহণের চেয়ে কোচিং সেন্টারের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও কোচিংয়ের পাঠদানের ধরন এক নয়। ফলে প্রশ্নের ধরনে পরিবর্তন এলে কোচিংনির্ভর শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়ে। এ ছাড়া মুঠোফোনে আসক্তি ও শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি কমে যাওয়াও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। যেসব কলেজের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করেননি, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কলেজগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ডেকে ফলাফল পর্যালোচনা করা হবে। এরপরও উন্নতি না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম আলী মনে করেন, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষবিমুখতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের যথাযথ তদারকির অভাব ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, মুঠোফোন ও ডিজিটাল যন্ত্রে আসক্তি নিয়ন্ত্রণে অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। করোনাকাল থেকে গত বছর পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা হয়েছে। এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
শিক্ষা সুরক্ষা কমিটি রাজশাহীর সদস্যসচিব ও ক্যাব রাজশাহীর সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন বলেন, শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের চেয়ে শিক্ষার্থীদের কোচিংনির্ভর হয়ে পড়া শিক্ষাব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা গেলে কোচিংয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো সম্ভব। এ জন্য শিক্ষকদের পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও নিয়মিত মূল্যায়ন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী না করে ফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২০ সালে শতভাগ পরীক্ষার্থী পাস করেছিলেন। ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৭ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮১ দশমিক ৬০ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৮১ দশমিক ২৪ শতাংশ। গত বছর পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশে। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪ হাজার ৫২০ জন। তাঁদের মধ্যে ছাত্র ১ হাজার ৯৬৫ জন এবং ছাত্রী ২ হাজার ৫৫৫ জন। পাসের হারেও ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা এগিয়ে। ছাত্রদের পাসের হার ৩৭ দশমিক ৭১ শতাংশ, ছাত্রীদের ৫৩ দশমিক ০৩ শতাংশ।
রাজশাহী বিভাগের আট জেলার ৭৪৩টি কলেজের শিক্ষার্থীরা ২০৮টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেন। এর মধ্যে মাত্র ৯টি কলেজের সব পরীক্ষার্থী পাস করেছেন। অন্যদিকে, ৩৯টি কলেজের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। জেলাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পাসের হার রাজশাহীতে ৫৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। সর্বনিম্ন নওগাঁয় ৩৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
ফলাফলের এই চিত্রে শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষকদের জবাবদিহি, অভিভাবকদের নজরদারি এবং পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসের উপযোগী প্রস্তুতির বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
Tag:
