
নিজস্ব প্রতিবেদক:
শিশুশ্রমের কারণে শিশুরা তাদের জীবনের অনাগত স্বপ্ন ভেঙে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে, এ মন্তব্য করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া বলেছেন, শিশুশ্রম শুধুমাত্র একটি আইনি সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকট নিরসনে এখনও সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকালে রাজশাহীর জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘শিশুশ্রম নির্মূলের জন্য বিভাগীয় কর্মশালা’য় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিশুশ্রমের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব ড. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া বলেন, শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুরা শিক্ষা ও স্বাভাবিক শৈশব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে তাদের শারীরিক, মানসিক ও মানবিক বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্ম ধ্বংসের ঝুঁকিতে পড়ছে। তিনি জানান, সরকার এসডিজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজসহ সকল ধরনের শিশুশ্রম নির্মূলে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব আরও বলেন, সরকারের দায়িত্ব কেবল আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিশুদের শিক্ষা, সুরক্ষা এবং মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কর্তব্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু শ্রমে নিযুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজারের বেশি শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
শিশুশ্রম নির্মূলে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, জাতীয় শিশুশ্রম কল্যাণ পরিষদ গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি ও পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত সভা ও কর্মশালা আয়োজনের জন্য প্রতি অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের তালিকা হালনাগাদ করে বর্তমানে ৪৩টি কাজ চিহ্নিত করা হয়েছে।
শিল্পখাতকে শিশুশ্রমমুক্ত ঘোষণার বিষয়ে তিনি জানান, ট্যানারি, সিল্ক, সিরামিক, কাঁচ, রপ্তানিমুখী চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্প, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, গার্মেন্টস এবং চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ এই ৮টি শিল্পখাতকে শিশুশ্রমমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিআইএফই-এর তত্ত্বাবধানে ৩ হাজার ৪৫৩ জন শিশুকে শ্রম থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
কর্মশালায় জানানো হয়, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত ‘ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন (৪র্থ পর্যায়)’ প্রকল্পের মাধ্যমে এক লাখ শিশুকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আগের প্রকল্পগুলোতে আরও প্রায় ৯০ হাজার শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে মুক্ত করা হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)সহ উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে যৌথভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ। স্বাগত বক্তব্য দেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ওমর মো. ইমরুল মহসিন। এছাড়াও রাজশাহী পুলিশ রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ শাহজাহান শিশু শ্রম মোকাবেলায় পুলিশের ভূমিকার কথা বলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. ফকরুল ইসলাম রাজশাহীতে শিশুশ্রমের প্রেক্ষাপট ও নির্মূলের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। ইউসেপ বাংলাদেশের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. শাহিনুল ইসলাম শিশুশ্রম নির্মূলে ইউসেপের ভূমিকা তুলে ধরেন। ডিআইএফই যুগ্ম মহাপরিদর্শক মিসেস জুলিয়া জেসমিন অর্জন ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন এবং আইএলও বাংলাদেশ জাতীয় পরামর্শদাতা হালিমা আক্তার জাতীয় প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রম পরিস্থিতি ও আইএলও-এর সহায়তার বিষয় তুলে ধরেন।
