
বিশেষ প্রতিবেদক:
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বর্তমান সংস্কার কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও দক্ষ কমিশন গঠন সময়ের দাবি। সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং অর্থপাচার প্রতিরোধে এমন একজন কমিশনার প্রয়োজন, যার দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, তদন্তে বিশেষ দক্ষতা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা রয়েছে। এই মানদণ্ড বিবেচনায় সদ্য অবসরে যাওয়া অতিরিক্ত আইজিপি ড. মো. আশরাফুর রহমানের নাম বিশেষভাবে গুরুত্বের সাথে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
ড. মো. আশরাফুর রহমান ১৯৯৫ সালে বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারে যোগদানের পর থেকে দীর্ঘ তিন দশকের অধিক সময় মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বরিশাল, সিলেট ও পটুয়াখালীর মতো জেলায় পুলিশ সুপার হিসেবে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা মাঠ প্রশাসনের জটিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাঁকে দক্ষ করে তুলেছে। বিশেষ করে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ডিআইজি (অপরাধ ব্যবস্থাপনা) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অপরাধ দমন ও প্রশাসনিক আধুনিকায়নে তাঁর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
এই সময়ে তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-সম্পর্কিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত তদারকি করেন এবং অর্থ পাচার-সংক্রান্ত একাধিক জটিল মামলার অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখেন।অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা অবসরের পরও লেখালেখির মাধ্যমে সমাজ সংস্কারে অবদান রেখে চলেছেন। বিভিন্ন পত্রিকায় পুলিশ বিভাগের পাঁচ দশকের আধুনিকায়ন নিয়ে ধারাবাহিক লেখা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার-কাঠামো নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে, যা সুধী মহলে সাড়া ফেলেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল সাহসী ও কার্যকর। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে তিনি নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে ৮৬৪ জনেরও বেশি অপরাধী গ্রেপ্তারসহ জননিরাপত্তা নিশ্চিতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
এ ছাড়া রাজনৈতিক মেরুকরণের শিকার পুলিশ বাহিনীকে পুনরায় সক্রিয় করতে স্থানীয় সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমন্বয়ের যে মডেল তিনি তৈরি করেছিলেন, তা সংকটকালীন প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ফেরাতে তাঁর নেতৃত্বের বিশেষত্ব প্রমাণ করে।
মাদকবিরোধী কার্যক্রমে বিশেষ ভূমিকা রেখে তিনি প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। ময়মনসিংহ রেঞ্জ অফিসে ডিজিটাল কমান্ড সেন্টার স্থাপন করে ৩২টি থানাকে আধুনিক সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসেন, যার মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির সহায়তায় রেঞ্জ পুলিশের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর হয়ে ওঠে।
রেঞ্জ পুলিশের সেবা ও সাফল্য জনগণের কাছে তুলে ধরতে তিনি একটি বর্ণিল পত্রিকা প্রকাশ করেন, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও সুধী মহলে পুলিশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি ও জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সভা-সমাবেশে অংশ নিয়ে তিনি পুলিশ বাহিনীর ভেঙে পড়া মনোবল পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়ের মাধ্যমে তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, উৎসাহ ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনেন।
শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি নিয়মিত অনুশীলন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন। তাঁর নেতৃত্বে ময়মনসিংহ রেঞ্জ পুলিশের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও জনআস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, যা প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়।
দীর্ঘ ১৬ বছর পদোন্নতিবঞ্চিত থাকা সত্ত্বেও তিনি পেশাগত দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হননি। এই চৌকস কর্মকর্তাকে আওয়ামী সরকার তাকে শুধুমাত্র পদোন্নতিবঞ্চিত করে নাই বরং বিভিন্ন ভাবে নিগৃহিত করেছে শুধুমাত্র ছাত্রজীবনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সভাপতি থাকার অভিযোগ তুলে। ‘৯০ এর গনতান্ত্রিক আন্দোলনে ড. মোঃ আশরাফুর রহমান গ্রেফতার হয়ে গাজীপুর জেলে কারাবাস করেন। তাঁর কর্মজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি আপসহীন ছিলেন। ব্যক্তিগত সততা ও মেধার সমন্বয় তাঁকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের জন্য একজন উপযুক্ত প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত করে তোলে। একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ডে পিএইচডি ডিগ্রিধারী হওয়ায় তিনি যেমন প্রথাগত তদন্তে দক্ষ, তেমনি তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারেও সমান পারদর্শী।
দুদকের কার্যকারিতা বাড়াতে এমন একজন কমিশনারের প্রয়োজন, যিনি জটিল অপরাধ চক্র ও অর্থ পাচারের কৌশলগুলো ভালোভাবে বোঝেন। ড. আশরাফুর রহমানের দীর্ঘ পুলিশি ক্যারিয়ার এবং অপরাধ তদন্তে তাঁর বিশেষ দক্ষতা দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও বিজ্ঞানসম্মত করতে সহায়ক হতে পারে। তাঁর নিয়োগ কমিশনের স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জনমনে আস্থা বৃদ্ধি করতে পারে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে দুদকের নতুন কমিশন গঠনে যোগ্য, সৎ ও মেধাবী নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। ড. মো. আশরাফুর রহমানের মতো একজন অভিজ্ঞ ও আপসহীন কর্মকর্তাকে কমিশনার হিসেবে বিবেচনা করা হলে তা দুদকের কাজে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। সংশ্লিষ্ট সার্চ কমিটি বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তাঁর ক্যারিয়ার ও পূর্ববর্তী কাজের রেকর্ড পর্যালোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় নিতে পারেন যা জন প্রত্যাশা পূরণে সহায়ক হবে।
