
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীতে অস্ত্র, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হত্যা চেষ্টা, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ একাধিক মামলার আসামি এবং নিজেকে রাজশাহী প্রেসক্লাবের সভাপতি পরিচয়দানকারী নজরুল ইসলাম জুলুকে আটক করেছে বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ। শুক্রবার (৫ জুন) দিবাগত রাতে রাজশাহী মহানগরীর খুলিপাড়া এলাকায় তার নিজ বাড়িতে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। পরে শনিবার আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
আটকের পর জুলুকে আদালতে পাঠানোর জন্য থানার হাজতখানা থেকে বের করা হলে উপস্থিত সাংবাদিকরা ভিডিও ধারণ করেন। এ সময় হাতে হাতকড়া থাকা অবস্থায় তিনি সাংবাদিক মাজারুল ইসলাম চপলের দিকে তেড়ে গিয়ে লাথি মারেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে রাজশাহীর পাঁচ সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার ভিডিও সাংবাদিকদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
হুমকির শিকার সাংবাদিকরা হলেন, রাজশাহী প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি শাহরিয়ার অন্তু, যুগ্ম সম্পাদক মো. নুরে ইসলাম মিলন, দপ্তর সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন বাবু, পাঠাগার সম্পাদক সুরুজ আলী এবং প্রেসক্লাব এর কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য জুলুর মামলার বাদি রাজিব আলী রাতুল।
সাংবাদিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নজরুল ইসলাম জুলু সশস্ত্র সহযোগীদের নিয়ে রাজশাহী প্রেসক্লাব দখল করেন। পরবর্তীতে প্রেসক্লাবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে মামলা বাণিজ্য, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
এর আগে রাজশাহী মহানগরীর সিনিয়র ফটো সাংবাদিক শামস রুমির দায়ের করা চাঁদাবাজির মামলায়ও তাকে আটক করা হয়েছিল। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিজ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে একাধিক ব্যক্তিকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি ও নির্যাতন করেছেন তিনি। তার নেতৃত্বে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং পরিচালিত হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, অস্ত্র মামলায় দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি পুনরায় বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। একই সময়ে রাজশাহী প্রেসক্লাব ও এর সদস্যদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে রাজিব আলী রাতুল একটি মামলা দায়ের করেন।
এছাড়াও নজরুল ইসলাম জুলুর বিরুদ্ধে তার পুত্রবধূর করা ধর্ষণের অভিযোগ এবং নিকট আত্মীয়কে যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের মামলার বর্তমান আইনি অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশের সিডিএমএস তালিকা অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম জুলুর বিরুদ্ধে অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে। তবে একাধিক গোয়েন্দা সূত্র দাবি করেছে, বাস্তবে তার বিরুদ্ধে মামলা সংখ্যা ২৪টিরও বেশি। এসব মামলার মধ্যে হত্যা, হত্যা চেষ্টা, অবৈধ অস্ত্র বহন, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক অভিযোগ রয়েছে।
রাজশাহী প্রেসক্লাবের সভাপতি ও প্রবীণ সাংবাদিক সাইদুর রহমান বলেন, “জুলু দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহী প্রেসক্লাবকে ভয় ও নির্যাতনের ঘাঁটিতে পরিণত করেছিলেন। সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, এমনকি নিজের আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত তার নানা নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে পুত্রবধূ ও নিকট আত্মীয়কে যৌন হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। একজন ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে যেভাবে সন্ত্রাস, ভয়ভীতি ও দখলদারিত্বের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা রাজশাহীর সাংবাদিক সমাজের জন্য কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, “জুলুর গ্রেপ্তার শুধু একজন আসামির গ্রেপ্তার নয়, এটি সাংবাদিকতার নামে গড়ে ওঠা একটি ভয়ভীতি ও সন্ত্রাসের চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমরা আশা করি, তার বিরুদ্ধে থাকা সকল অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে।”
বোয়ালিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রবিউল ইসলাম জানান, “অভিযান চালিয়ে নজরুল ইসলাম জুলুকে আটক করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।”
নজরুল ইসলাম জুলুর গ্রেপ্তারে রাজশাহীর সাংবাদিক সমাজ, সচেতন নাগরিক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে বিভিন্ন মহল অভিমত ব্যক্ত করেছে। তাদের মতে, সাংবাদিকতার আড়ালে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে এমন কঠোর ও তথ্যভিত্তিক অভিযান অব্যাহত থাকলে সমাজে আইনের শাসন আরও সুসংহত হবে।
