আজ- , ,

রাজশাহীতে হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর, বাড়ছে পরিবেশ ও নগরজীবনের ঝুঁকি

by Prokash Kal

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী:

একসময় পুকুর, দিঘি ও জলাশয়ের জন্য পরিচিত ছিল রাজশাহী মহানগরী। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা এসব জলাধার ছিল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম প্রাকৃতিক উপাদান। মানুষের দৈনন্দিন পানির চাহিদা পূরণ থেকে শুরু করে বৃষ্টির পানি ধারণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, অগ্নিনির্বাপণ এবং নগরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পুকুরগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন সম্প্রসারণের চাপে একের পর এক পুকুর ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী জলাধারগুলো এবং বাড়ছে পরিবেশগত বিপর্যয় ও নগরজীবনের নানা ঝুঁকি।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, একটি নগরীর প্রাকৃতিক জলাধার শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের উপাদান নয়, বরং পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বৃষ্টির সময় পুকুর ও জলাশয় অতিরিক্ত পানি ধারণ করে। এসব জলাধার কমে গেলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অপর্যাপ্ত নালা ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে।

পুকুর কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে নগরীর তাপমাত্রার ওপরও। জলাধার ও আশপাশের সবুজ পরিবেশ স্থানীয়ভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। এসব প্রাকৃতিক উপাদান হারিয়ে যাওয়ায় গ্রীষ্মকালে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তাপের তীব্রতা ও অস্বস্তি বাড়ছে। একই সঙ্গে পুকুরের পানি মাটির নিচে প্রবেশের সুযোগ কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে পানির উৎস হিসেবে পুকুরগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়ায় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিনির্বাপণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ভূমিসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী বিভিন্ন কৌশলে পুকুর ভরাট করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে সচল পুকুরকে বন্ধ জলাশয় হিসেবে দেখিয়ে ভরাটের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ অনুযায়ী, নির্ধারিত শ্রেণির জলাধার ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা ভরাট বা শ্রেণি পরিবর্তনের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এরপরও নগরীর বিভিন্ন স্থানে পুকুর ভরাটের অভিযোগ ওঠায় প্রশাসনের নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে, অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমিতে পুকুর খননের কারণেও কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে তিন ফসলি জমিতে পুকুর খনন করা হলে কৃষিজমির পরিমাণ কমে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের অভাবে পুকুর ভরাটের প্রবণতা থামছে না। কোথাও কোথাও ভরাটের কাজ শুরু হওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। রাজশাহীর পুকুরগুলো শুধু পরিবেশগত সম্পদ নয়, নগরবাসীর জীবনযাপন ও স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে।

পরিবেশ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য নগরী নিশ্চিত করতে রাজশাহীর সব পুকুর ও জলাশয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি সীমানা নির্ধারণ, ভূমির শ্রেণি যাচাই, অবৈধ ভরাটের অভিযোগ তদন্ত এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। রাজশাহীকে বাসযোগ্য নগরী হিসেবে ধরে রাখতে হলে শুধু সড়ক, ভবন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি নগরীর প্রাকৃতিক জলাধারগুলো সংরক্ষণ করা অপরিহার্য। অন্যথায় নগরবাসীকে জলাবদ্ধতা, তীব্র গরম, ভূগর্ভস্থ পানির সংকট ও অগ্নিনির্বাপণে বাড়তি ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।

Share this news as a Photo Card

You may also like

Leave a Comment

শিরোনাম:
08 November 2026

রাজশাহীতে হারিয়ে যাচ্ছে পুকুর, বাড়ছে পরিবেশ ও নগরজীবনের ঝুঁকি

www.prokashkal.com |
/Prokashkal