
এম এ রশিদ, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি :
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের হরিনগর বাজার এলাকায় অব্যাহত ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাধীন ৫ নং পোল্ডারের ১৪ নম্বর হরিনগর স্লুইজ গেট মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি অসাধু চক্রের অপতৎপরতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে শ্যামনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, উপকূলীয় এলাকায় ওয়াপদা বাঁধের অভ্যন্তরে অতিবৃষ্টি ও বন্যার পানি নিষ্কাশনের জন্য ডেনিস গেট পদ্ধতিতে এসব স্লুইজ গেট নির্মাণ করা হয়। এ ধরনের গেটের নকশা অনুযায়ী লোকালয়ের পানি নদীতে বের হয়ে যায়, কিন্তু জোয়ারের সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে লোহার পাটা বন্ধ হয়ে নদীর লবণাক্ত পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে না।
ফলে এলাকার মানুষের জানমাল, কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপকূলীয় অঞ্চলের কিছু ব্যক্তি বাগদা চিংড়ি চাষের উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াপদা বাঁধের তলদেশে অবৈধ বক্সকালভার্ট ও পাইপ স্থাপন করে লোনা পানি উত্তোলন করে আসছিল। এতে পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি বাঁধ ও স্লুইজ গেট ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এ অবস্থায় ২০২৫ সালের শেষ দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড অবৈধ পাইপ অপসারণ এবং কয়েকটি স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করলেও একটি অসাধু চক্রের অপতৎপরতা বন্ধ হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, অবৈধভাবে চিংড়ি চাষ অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যে হরিনগর স্লুইজ গেট সংলগ্ন মথুরাপুর গ্রামের অনিল মণ্ডলের ছেলে দীপংকর মণ্ডল ও মৃত দেবেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ছেলে চিত্তরঞ্জন মণ্ডলসহ আরও কয়েকজনকে ভাড়াটিয়া হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা ভাটার সময় স্লুইজ গেটের লোহার পাটার নিচে ঢালাই ব্লক প্রবেশ করিয়ে জোয়ারের পানি পোল্ডারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, জোয়ারের পানির প্রবল চাপে গেটের লোহার পাটা বেঁকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর আগেও একই কৌশলে কয়েকটি মূল্যবান পাটা ধ্বংস করা হয়েছে।
এছাড়া মাঝে মাঝে বাঁশ ও মোটা রশি (কাছি) দিয়ে লোহার পাটা বেঁধে উল্টে রাখা হয়, যাতে জোয়ারের পানি অবাধে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। এভাবে তীব্র স্রোতে পানি প্রবেশের ফলে স্লুইজ গেটের সম্মুখভাগে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। গেটের তলদেশের মাটি সরে গিয়ে বর্তমানে এটি ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, যে কোনো সময় চুনা নদীর স্লুইজ গেটের মতো এ গেটটিও ধসে যেতে পারে।
সেক্ষেত্রে শ্যামনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হবে এবং পানীয় জলের সংকট, কৃষিজমির ক্ষতি, মৎস্যসম্পদের ধ্বংস, গৃহপালিত পশুপাখির ক্ষয়ক্ষতি ও বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। এদিকে স্লুইজ গেট দিয়ে তীব্রবেগে পানি প্রবেশ করায় গেটসংলগ্ন খালের দুই তীরে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। হরিনগর বাজার থেকে মুন্সিগঞ্জ বাজার গ্রোথ সেন্টার কানেক্টিং রোড (জিসিসিআর) সড়কটিও বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট শাখা কর্মকর্তা (এসও) প্রিন্সের সহযোগিতা ছাড়া কীভাবে বারবার বাঁশ ও রশি দিয়ে লোহার পাটা উল্টে বেঁধে রেখে পানি উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ড চালানো সম্ভব হচ্ছে।
অনেকের দাবি, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজরদারির আওতায় থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে শাখা কর্মকর্তা (এসও) প্রিন্সের ০১৩১৮-২৩৫৬৯০ নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সঞ্জয় নামে একজন কর্মচারী ফোনে কথা বলার পর বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীকেও ফোনে পাওয়া যায়নি।
তবে নির্বাহী প্রকৌশলী-১, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, সাতক্ষীরার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। স্থানীয়রা দ্রুত তদন্তপূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্লুইজ গেটটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন, যাতে শ্যামনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ সম্ভাব্য দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পায়।
