আজ- মঙ্গলবার, ১৮ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিরাজগঞ্জে যমুনার ভাঙনে বিলীন ২ শতাধিক বাড়িঘর

by Prokash Kal

মোঃ শাহান আলী, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের কুরসি ও ধীতপুর গ্রামে যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে গত দুই সপ্তাহে দুই শতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অসহায় পরিবারগুলো এখন পলিথিনের ছাউনি কিংবা মাছ ধরার জাল দিয়ে ঘেরা জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করছে। অনেকেরই মাথা গোঁজার মতো কোনো জায়গা নেই।

ভাঙনরোধে দ্রুত বালুভর্তি জিওব্যাগ বা জিওটিউব ফেলার দাবিতে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিকেলে কুরসি বাজার এলাকায় নদীর পাড়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন জিন্নাহ মন্ডল, আব্দুল মালেক, আব্দুস সামাদ, ফিটার সরদার, লস্কর আলী, আব্দুল মান্নান, মহির উদ্দিন ও নীল চান প্রামাণিকসহ স্থানীয়রা।

বক্তারা বলেন, বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর, ধীতপুর, কুরসি ও বারপাখিয়াসহ গালা ইউনিয়নের মোহনপুর ও হাতকোড়া এলাকায় যমুনা নদীর তীব্র ভাঙন চলছে। গত কয়েক মাসে শত শত বাড়িঘরের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের তীব্রতা এতটাই বেশি যে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পাচ্ছে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও বহু বাড়িঘর, আবাদি জমি ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। তারা পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ভাঙনকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিওব্যাগ বা জিওটিউব ডাম্পিংয়ের দাবি জানান।

ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, কুরসি ও ধীতপুর গ্রামের দুই শতাধিক বাড়িঘর নদীতে বিলীন হওয়ায় অনেক পরিবার এখন আশ্রয়হীন। কেউ পলিথিন টানিয়ে, আবার কেউ মাছ ধরার জাল দিয়ে ঘিরে কোনো রকমে বসবাস করছেন। ভাঙনের কারণে ধীতপুর-কুরসি গরুর হাট ও বাজারও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য এবং গরু-ছাগল বিক্রিতে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।

এলাকাবাসী আরও জানান, ভাঙনকবলিত অনেক বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটছে। গরু চুরি ঠেকাতে অনেকেই রাত জেগে গবাদিপশু পাহারা দিচ্ছেন। গরমে গবাদিপশুরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, ভাঙনের তাণ্ডবে এ পর্যন্ত দুটি মসজিদ-মাদ্রাসা, দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি অফিসঘর, দুই শতাধিক বাড়িঘর, প্রায় দুই হাজার বিঘা আবাদি জমি ও অসংখ্য গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এসব জমিতে ধান, পাট, সরিষা, বাদাম, তিল, কাউন, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হতো। জমি হারিয়ে শত শত কৃষক এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

ধীতপুর গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা আন্না খাতুন (রুমা) জানান, স্বামী তাকে ছেড়ে যাওয়ার পর এক শিশুকন্যাকে নিয়ে বাবা-মায়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সম্প্রতি যমুনার ভাঙনে বাবার বসতঘরটিও সরিয়ে নিতে হয়েছে। এখন তিনি মা ও শিশুকন্যাকে নিয়ে একটি পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করছেন। ঘরের এক পাশ মাছ ধরার জাল দিয়ে ঘেরা এবং অন্য পাশের পাটকাঠির বেড়া পচে ভেঙে পড়ছে। তারপরও যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় সেখানেই মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের।

কুরসি গ্রামের ইয়াসিন মোল্লা বলেন, “যমুনার ভাঙনে আমার আট বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এসব জমিতে ধান, ভুট্টা, সরিষা ও বিভিন্ন সবজি চাষ করে স্বচ্ছলভাবে চলতাম। এখন সব হারিয়ে পথে বসেছি। আমাদের গোষ্ঠীর প্রায় ৬০ বিঘা জমিও নদীতে চলে গেছে।”

ধীতপুর গ্রামের আছিয়া খাতুন বলেন, “বাড়িঘর নদীতে চলে যাওয়ার পর এখন শূন্য ভিটায় পলিথিন টানিয়ে থাকছি। বৃষ্টি হলে সবকিছু ভিজে যায়। ছেলে-মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।”

আরেক বাসিন্দা শামছুল হক জানান, বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় পাশের শ্রীপুর গ্রামে অন্যের জমি বছরে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। বছর শেষে সেই টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

ধীতপুর ঘোনাপাড়া গ্রামের হাফিজ উদ্দিন, নুরুল ইসলাম ও জিন্নাহ মন্ডল বলেন, ভাঙনরোধে দ্রুত বালুভর্তি জিওটিউব বা জিওব্যাগ ফেলা প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে ১০-১২টি স্থানে বাঁশের ছটকা তৈরি করে বালুর বস্তা ডাম্পিং করা হলে ভাঙনের তীব্রতা কমানো সম্ভব বলে দাবি করেন তারা।

শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা সারমিন জানান, তিনি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণের চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে এবং অসহায়দের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মখলেছুর রহমান জানিয়েছেন, শাহজাদপুরের সোনাতনী ইউনিয়ন চরাঞ্চল হওয়ায় সেখানে বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো প্রকল্প নেই। নতুন প্রকল্প পাওয়া গেলে সেখানে কাজ করা হবে।

এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, নদীভাঙন এখনই ঠেকানো না গেলে সামনে আরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

You may also like

Leave a Comment

শিরোনাম: