আজ- বৃহস্পতিবার, ১লা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রুয়েটে ইমাম নিয়োগে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ 

by Prokash Kal

রুয়েট প্রতিনিধি:

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) শহীদ শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক হলের মসজিদে ইমাম নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। নিয়োগের আগে বাছাই ও পরীক্ষা নেওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ৩০০ জন প্রার্থীকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাখার পরও তাদের পরীক্ষা ছাড়াই একজনকে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির কোরআন তিলাওয়াত, তাজবিদ, নামাজসংক্রান্ত মাসআলা এবং দায়িত্ব পালনের নিয়মিততা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।

প্রায় ৮০০-এর বেশি আবাসিক শিক্ষার্থীর এই হলে দীর্ঘ সময় স্থায়ী ইমাম না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে কোরআন তিলাওয়াতে দক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে নামাজ ও আজান পরিচালনা করতেন। প্রায় এক বছর ধরে এভাবে চলার পর শিক্ষার্থীরা হল প্রশাসনের কাছে একজন স্থায়ী ইমাম নিয়োগের দাবি জানান।

হলের শিক্ষার্থী সজিদ জানান, হলের তহবিলে অমুসলিম শিক্ষার্থীদের ফিও যুক্ত থাকায় ইমাম নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে বলে হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়। পরে তারা বিষয়টি লিখিতভাবে ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রোবিউল ইসলাম সরকারকে জানান। শুরুতে কেন্দ্রীয় মসজিদ থাকায় আলাদা হল মসজিদের ইমাম প্রয়োজন নেই—এমন বক্তব্য দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীদের দাবি বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়।

তবে দুই থেকে তিন মাসেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আবারও উদ্যোগ নেন। এ সময় প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর সংগ্রহ করে আবেদন করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে নিয়ে ইমামের সম্মানী, থাকার ব্যবস্থা ও অন্যান্য ব্যয় বহনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তারা।

পরবর্তীতে রুয়েটের পক্ষ থেকে তিনজন ইমাম ও দুজন মুয়াজ্জিন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এতে প্রায় ৪০০টি আবেদন জমা পড়ে এবং প্রায় ৩০০ জনকে বাছাই করে পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষার জন্য রাখা হয় বলে শিক্ষার্থীদের দাবি। কিন্তু সেই পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই একজনকে হল মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এ বিষয়ে হল প্রশাসনের কাছে জানতে চাইলে তাদের জানানো হয়, নিয়োগের বিষয়টি উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় হয়েছে এবং হল তহবিল থেকেই ইমামের বেতন ও আবাসনের ব্যয় বহন করা হবে। এতে নির্ধারিত নিয়োগপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই ইমামের কোরআন তিলাওয়াত, তাজবিদ ও নামাজসংক্রান্ত মাসআলা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আপত্তি তৈরি হয়। পরে হল প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রাজশাহী তালীমুদ্দীন একাডেমির দুই শিক্ষককে দিয়ে তার দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয় বলে শিক্ষার্থীরা জানান। শিক্ষার্থীদের কাছে থাকা ওই মূল্যায়নপত্র অনুযায়ী, মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে তিনি ৩১ নম্বর পেয়েছেন—কিরাতে ২৫-এর মধ্যে ১০, তাজবিদে ২৫-এর মধ্যে ৫ এবং মাসআলায় ৫০-এর মধ্যে ১৬।

এই মূল্যায়নের কপি শিক্ষার্থীরা হল প্রশাসনের কাছে প্রিন্ট ও সফট কপি আকারে জমা দিয়েছেন বলে জানান। তাদের প্রশ্ন, নিয়োগের আগে যদি যোগ্যতা যাচাই করা হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তীতে এ ধরনের মূল্যায়নের প্রয়োজন হলো কেন এবং বাছাই তালিকায় থাকা প্রায় ৩০০ প্রার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার আগেই কীভাবে নিয়োগ সম্পন্ন হলো।

এ ছাড়া ইমামের দায়িত্ব পালনের নিয়মিততা নিয়েও অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এমটিই বিভাগের ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইকবাল জানান, দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম সপ্তাহের পর ওই ইমাম নিয়মিত আজান দিতেন না এবং অনেক সময় শুধু নামাজের সময় উপস্থিত থাকতেন। ফলে শিক্ষার্থীদেরই আজান দিতে হয়েছে বলে তার দাবি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, পূর্বঘোষণা ছাড়াই অনুপস্থিত থাকা এবং শুক্রবার-শনিবার মিলিয়ে দুই দিনের ছুটির ঘটনাও ঘটেছে।

ছুটির সময় একজন শিক্ষার্থীর নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে ইমামের দায়িত্ব পালনের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন ইকবাল। তার দাবি, প্রথম দিকে শিক্ষার্থীর সম্মতি থাকলেও পরবর্তী সময়ে তার অজ্ঞাতসারে এমনটি করা হয়।

ইমামের আবাসন ও খাবারের সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। সজিদের দাবি, ইমামের ছেলেকেও হলের একটি কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং শুরু থেকেই হলের ডাইনিংয়ে বিনামূল্যে খাবারের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অথচ শিক্ষার্থীরা নিজেদের অর্থে ইমামের ব্যয় বহনের প্রস্তাব দেওয়ার সময় শুধু ইমামের থাকার জন্য কক্ষ দেওয়ার কথা বলেছিলেন।

ইমামের হিফজ ও ক্বারিয়ানা-সংক্রান্ত সনদ ও যোগ্যতা নিয়েও শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, দায়িত্ব পাওয়ার পর ক্বারিয়ানা কোর্স সম্পন্ন করার জন্য প্রায় এক মাসের ছুটি চাওয়ার বিষয়টি তার নিয়োগের আগে যোগ্যতা যাচাই হয়েছিল কি না, সে প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে।

বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীরা দুই দিন ধরে উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করলেও দ্বিতীয় দিন তাদের সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তারা। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজ জানান, গত পাঁচ-ছয় মাসে তারা দুইবার উপাচার্য, দুইবার ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক এবং পাঁচ-ছয়বার হল প্রভোস্টের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। পাশাপাশি ইমামের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে শিক্ষার্থীদের মতামতও নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে, হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. আল-আমিন-আল-আজাদুল ইসলাম বলেন, আগে যাকে হল মসজিদের ইমামের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তিনি বর্তমানে আর হল মসজিদে ইমামের দায়িত্বে নেই। তাকে আর ইমাম হিসেবে না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, ভবিষ্যতে ইমাম নিয়োগে স্পষ্ট ও স্বচ্ছ বাছাইপ্রক্রিয়া অনুসরণ, প্রার্থীদের ধর্মীয় জ্ঞান ও সনদ যথাযথভাবে যাচাই, দায়িত্ব পালনের অনিয়মের বিষয়ে ব্যাখ্যা এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি স্থায়ী ইমাম নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

You may also like

Leave a Comment

শিরোনাম: