
নিজস্ব প্রতিবেদক:
নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পরিবেশ ও নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মী, গবেষক, কৃষক ও নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
‘নদী, জীবন ও জীবিকার অধিকার, মানুষের কণ্ঠে টেকসই আগামীর অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজশাহীর নওহাটা বাজারসংলগ্ন বারনই নদীপাড়ে ‘নদীপাড়ের মানুষের মুখে নদী কথা: জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা এবং করণীয়’ শীর্ষক কমিউনিটি নীতি সংলাপে এ দাবি জানানো হয়।
নওহাটা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি, বারসিক, গ্রিন কোয়ালিশন ও বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।এতে সভাপতিত্ব করেন নওহাটা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি সচীন হালদার।
সংলাপে বক্তারা বলেন, নদী শুধু পানি প্রবাহের পথ নয়; এটি পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম ভিত্তি। নদীর প্রবাহ, নাব্যতা, পানি ও জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তনের সঙ্গে নদীপাড়ের মানুষের পেশা, আয়, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাও সরাসরি জড়িত। তাই নদী ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক তথ্যের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে গুরুত্ব দিতে হবে।
নদীপাড়ের বাসিন্দা চিত্তরঞ্জন হালদার বলেন, ‘এই পানি দিয়ে আগে আমরা ভাত, ডাল রান্না করে খেয়েছি। এখন এই পানি গায়ে লাগলেই চুলকানি শুরু হয় এবং ঘা হয়ে যায়।’
আরেক বাসিন্দা নুজু হালদার অভিযোগ করে বলেন, প্রতিবছর আশ্বিন-কার্তিক মাসে শহরের দূষিত পানি নদীতে ছাড়া হয়। তখন নদীর মাছ মরে ভেসে ওঠে। এ বছরও পানি ছাড়ার পর বারনই নদীতে মাছ মরেছে।
পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, নদীকে শুধু পানি প্রবাহের পথ হিসেবে না দেখে জীবন্ত প্রতিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বরেন্দ্র অঞ্চলের নদীগুলোর জন্য সমন্বিত নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচি নেওয়ার পাশাপাশি নদী ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
নৃবিজ্ঞানী ও পরিবেশ আইন গবেষক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, নদীনির্ভর মানুষের স্থানীয় জ্ঞান ও প্রথাগত অধিকারকে স্বীকৃতি না দিলে কার্যকর নদী শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। নদী দখল, দূষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও নীতির কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি তথ্যের স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সামাজিক ও কৃষক আন্দোলনের নেতা মাহমুদ জামাল কাদেরী বলেন, নদী রক্ষায় বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়; নদীর প্রবাহ, জলাভূমি, প্রাণবৈচিত্র্য ও নদীনির্ভর মানুষের অধিকারকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রয়োজন।
গ্রিন কোয়ালিশন, পবা উপজেলার সভাপতি রহিমা খাতুন বলেন, নদীর সংকট শুধু নদীপাড়ের মানুষের সমস্যা নয়। এর প্রভাব কৃষি, খাদ্য, আয় ও স্থানীয় জীবনের ওপর পড়ে। নদী রক্ষার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী, কৃষক, মৎস্যজীবী ও তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সংলাপে বারনই নদী ও সংযুক্ত জলপ্রবাহের পাশাপাশি পদ্মা-গঙ্গাসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের নদীগুলোর জন্য একাধিক নীতিগত দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে-বারনই ও সংযুক্ত নদীগুলোর সমন্বিত মানচিত্র তৈরি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও সংযোগ সুরক্ষায় বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, দূষণের উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধ করা, নদী ও তীরের অবৈধ দখল শনাক্ত করে সময়বদ্ধ ব্যবস্থা নেওয়া এবং নদী পুনরুদ্ধারকে শুধু খননের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত পুনরুদ্ধার করা।
এ ছাড়া নদী প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকার সুরক্ষা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, কমিউনিটি নদী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু, নদী-সংক্রান্ত তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
নিয়মিত কমিউনিটি নদী সংলাপ ও গণশুনানির মাধ্যমে নদী রক্ষায় সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং এর অগ্রগতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করারও দাবি জানান সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা।
