
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ছাত্র জনতার আন্দোলনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের অন্যান্য প্রশাসনিক খাতের মতো পুলিশ প্রশাসনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ময়মনসিংহ রেঞ্জ পুলিশের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালনকারী দুই ডিআইজি—ড. মো. আশরাফুর রহমান এবং পরবর্তীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত মো. আতাউল কিবরিয়ার কার্যকাল নিয়ে স্থানীয় জনমনে ও গণমাধ্যমে ভিন্নধর্মী আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। দুই কর্মকর্তার দায়িত্বকাল পর্যালোচনায় প্রশাসনিক কার্যক্রম ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় স্পষ্ট পার্থক্যের চিত্র উঠে এসেছে।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থির পরিস্থিতিতে, যখন পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ব পালনে অনীহা ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়, তখন ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. মো. আশরাফুর রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি পুলিশ সদস্যদের মনোবল ফিরিয়ে আনা এবং জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর প্রায় ছয় মাসের দায়িত্বকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অভিযান জোরদার করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ সময়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৮০০ নেতাকর্মীকে বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়। পাশাপাশি মাদক, জুয়া ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনবহুল এলাকায় সচেতনতামূলক সভা-সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
এ সময় প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত ও দক্ষ কর্মকর্তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রেঞ্জ কার্যালয়ে মিডিয়া সেন্টার, অপস মনিটরিং ইউনিট ও আইসিটি ইউনিট সমন্বয়ে আধুনিক ‘রেঞ্জ কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার’ স্থাপন করা হয়।
তবে ড. আশরাফুর রহমানের কঠোর অবস্থানের কারণে অপরাধী চক্র ও একটি প্রভাবশালী মহল অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বদলির জন্য তৎপর হয় বলে স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অর্থের বিনিময়ে বদলির ষড়যন্ত্রের অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়, যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
ড. আশরাফুর রহমানের বদলির পর ময়মনসিংহ রেঞ্জের দায়িত্ব নেন মো. আতাউল কিবরিয়া। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর সময়ে আগে গ্রেপ্তার হওয়া প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অনেকেই দ্রুত জামিনে মুক্তি পান। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তাদের একটি অংশ সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে যায় এবং অন্যরা এলাকায় পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে।
সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয় থানাগুলোতে ওসি পদায়ন নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, রেঞ্জের ৩৬টি থানার মধ্যে প্রায় ২২টিতে অতীতে সুবিধাভোগী বা ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে ভালুকা মডেল থানায় সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হুমায়ুন কবীরকে ওসি হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এ ছাড়া সাধারণ সেবাগ্রহীতা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে ডিআইজি কার্যালয়ের আচরণ নিয়েও অসন্তোষের অভিযোগ ওঠে।
পরবর্তীতে এসব বিষয় নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মো. আতাউল কিবরিয়াকে ময়মনসিংহ রেঞ্জ থেকে বদলি করে অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) সংযুক্ত করা হয়। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান।
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহ রেঞ্জ পুলিশের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালনকারী এই দুই ডিআইজির কার্যকাল নিয়ে জনপরিসরে ভিন্নধর্মী মূল্যায়ন রয়েছে। একদিকে ড. আশরাফুর রহমানের সময়কে আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার ও প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন অনেকে, অন্যদিকে মো. আতাউল কিবরিয়ার দায়িত্বকালকে ঘিরে রাজনৈতিক পুনর্বাসন, পদায়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নতুন নেতৃত্বের অধীনে ময়মনসিংহ রেঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জনসেবার মান কতটা উন্নত হয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।
