
রুয়েট প্রতিনিধি:
বর্ণাঢ্য আয়োজন ও দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) উদযাপিত হয়েছে ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ২০২৬’। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আমন্ত্রিত অতিথিদের অংশগ্রহণে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়।
সকাল সাড়ে ৯টায় প্রশাসনিক ভবনের সামনে জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। এ সময় তিনটি পায়রা অবমুক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, রুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস. এম. আবদুর রাজ্জাক ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেনসহ অতিথিরা।
এরপর রুয়েট প্রাঙ্গণে শহীদ শিক্ষার্থীদের স্মরণে দোয়া ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় আয়োজিত গবেষণা পোস্টার ও স্টার্টআপ মডিউল প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন আমন্ত্রিত অতিথিরা। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের গবেষণা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ উপস্থাপন করেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও উদ্ভাবনচর্চাকে আরও উৎসাহিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন অতিথিরা।
একই সময়ে রক্তদাতা সংগঠন ‘নিরব’-এর উদ্যোগে আয়োজিত ক্যাম্পেইনে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা ও চক্ষু পরীক্ষা সেবা প্রদান করা হয়।
সকাল সাড়ে ১০টায় প্রশাসনিক ভবনের সামনে থেকে বের করা হয় বর্ণাঢ্য আনন্দ র্যালি। শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে র্যালিটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
পরে কনফারেন্স কক্ষে ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন প্রদর্শনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস. এম. আবদুর রাজ্জাক। এ সময় উপ-উপাচার্য, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনা সভায় রুয়েটের শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন অতিথিরা। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অর্জন, গবেষণার পরিধি এবং দেশের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি খাতে রুয়েটের ভূমিকা আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন,“রুয়েটের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে উপস্থিত হতে পেরে আমি গর্বিত ও আনন্দিত। ১৯৬৪ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরুর পর রুয়েট শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আমরা আশাবাদী। গবেষণার লক্ষ্য শুধু পাবলিকেশন বা সাইটেশন নয়; বাস্তব সমস্যার সমাধান ও মানুষের কল্যাণে তা কাজে লাগাতে হবে। উদ্ভাবনকে বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করা ইউজিসির অন্যতম দায়িত্ব। গবেষণাকে এগিয়ে নিতে ‘রিসার্চ রেভলিউশন’-এর মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তাই হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। একই সঙ্গে নৈতিকতা ও সামাজিক বন্ধনকে গুরুত্ব দিয়ে মেধা ও প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। শুধু সার্টিফিকেট নয়, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য।”
সভাপতির বক্তব্যে রুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস. এম. আবদুর রাজ্জাক বলেন,
“আজ রুয়েটের ৬২ বছরের গৌরবময় পথচলায় আমরা পদার্পণ করেছি। দীর্ঘ এই যাত্রায় রুয়েটের শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়নে অবদান রাখা সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই। বিশেষ করে মহীয়সী নারী বেগম খালেদা জিয়া, যাঁর সময়ে রুয়েট পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। সরকার গবেষণা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়েছে এবং আগামী বছরে তা আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছি। রুয়েটসহ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও উদ্ভাবনে ইউজিসি সবসময় পাশে থাকবে বলে প্রত্যাশা করি। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাবেক শিক্ষার্থী—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রুয়েট পরিবার এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী দিনেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে আমরা কাজ করে যাব।”
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে চিত্রাঙ্কনসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও আয়োজনে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান করা হয়। পরে যোহরের নামাজ শেষে রুয়েট কেন্দ্রীয় মসজিদে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রা, শহীদ ও প্রয়াত সদস্যদের রুহের মাগফিরাত এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি এতিমদের মাঝে খাবার বিতরণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের আয়োজনকে আরও অর্থবহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দিনব্যাপী এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রুয়েটের দীর্ঘ পথচলা, শিক্ষা ও গবেষণায় অর্জন, উদ্ভাবনী কার্যক্রম এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা তুলে ধরা হয়। প্রতি বছর ১ সেপ্টেম্বর রুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন করে। দিবসটির আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখা এবং ভবিষ্যতে শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে আরও এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
